বর্ষায় একই সঙ্গে দুই রোগের ঝুঁকি, দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই বাড়ছে উদ্বেগ

আগস্ট ০৯ ২০২৬, ১৩:৩৪

Spread the love

নাজনীন আক্তার: দেশজুড়ে হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে চিকুনগুনিয়া। কারণ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া—দুই রোগই একই বাহক এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণও দ্রুত বাড়তে পারে। ফলে একসঙ্গে দুটি মশাবাহিত রোগের চাপ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও সংকটে ফেলতে পারে।

গত বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ১৯ হাজার ৪৯০ জন চিকুনগুনিয়া রোগী শনাক্ত হয়। বছরের প্রথম চার মাসে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও বর্ষা শুরু হওয়ার পর সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালে এডিস মশার বংশবিস্তার বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। তাই বর্ষা শুরুর আগেই কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন না করলে চলতি বছরও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

সাম্প্রতিক কয়েক বছরের তথ্যও উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে দেশে চিকুনগুনিয়া রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৬৮৭ জন এবং ২০২৫ সালে রোগীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেড়ে ১৯ হাজার ৪৯০ জনে পৌঁছায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দীর্ঘদিন পানি জমে থাকা, নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার প্রজনন এবং মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়ের অভাবের কারণে এ সংক্রমণ বাড়ছে।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া একই বাহক Aedes aegypti ও Aedes albopictus মশার মাধ্যমে ছড়ায়। দিনের বেলায় কামড়ানো এই মশা বাসাবাড়ির আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। ফুলের টব, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, ছাদের ট্যাংক কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা সামান্য পানিও এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ফলে যে এলাকায় ডেঙ্গু বাড়ে, সেই এলাকাতেই চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও অনেক বেশি থাকে।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাথমিক উপসর্গের মধ্যে মিল থাকলেও রোগ দুটির জটিলতায় পার্থক্য রয়েছে। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির তীব্র জ্বরের পাশাপাশি অসহ্য অস্থিসন্ধির ব্যথা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। অন্যদিকে ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ, প্লাটিলেট কমে যাওয়া, শক সিনড্রোম ও অঙ্গ বিকলের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই জ্বর হলে রোগ নির্ণয়ে সতর্কতা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।

চিকুনগুনিয়া শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ভারতের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসেই দেশটিতে ৩০ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন এবং প্রায় ১ হাজার ৭৫০ জন পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও কেরালায় রোগটির প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। পাকিস্তানে ২০১৬ সালের বড় প্রাদুর্ভাবের পর থেকে করাচি ও অন্যান্য বড় শহরে নিয়মিত সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। নেপালে ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়াও ছড়িয়ে পড়ছে। ভুটানে বড় প্রাদুর্ভাব না হলেও দেশটিকে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের তালিকায় রেখেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ১১৯টির বেশি দেশ ও অঞ্চলে চিকুনগুনিয়া সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং প্রায় ৫৬০ কোটির বেশি মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করছে, যেখানে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এডিস মশার বিস্তার নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল বললেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া একই মশার মাধ্যমে ছড়ায়। তাই ডেঙ্গু বাড়লে চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। বর্তমানে কার্যকর ভ্যাকসিনের সীমাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফগিং করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন বছরজুড়ে লার্ভা ধ্বংস অভিযান, নিয়মিত এডিস জরিপ, নির্মাণাধীন ভবন ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কঠোর নজরদারি এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ার পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো এবং রোগের তথ্য নিয়মিত প্রকাশেরও পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা শুরুর আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ার বিস্তারও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অন্যথায় একই সময়ে দুটি মশাবাহিত রোগের সংক্রমণ দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সময় থাকতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নেই।

এই বিভাগের আরো খবর


আরো সংবাদ ... আরও