হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ৩–৮ মাস বয়সী শিশু
নাজনীন আক্তার: মায়ের কোলের চার-পাঁচ মাসের একটি শিশু। পৃথিবীতে আসার পর এখনো ঠিকমতো বসতে শেখেনি, হাঁটা তো দূরের কথা। কিন্তু এরই মধ্যে তাকে লড়তে হচ্ছে হামের মতো প্রাণঘাতী সংক্রমণের সঙ্গে। এমন শিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে দেশের হাসপাতালগুলোতে। অবাক করার বিষয় হলো, এদের বেশিরভাগই এমন বয়সে, যখন সরকারি নিয়ম অনুযায়ী হাম-রুবেলার প্রথম টিকাটিই এখনো পাওয়ার কথা নয়।
দেশজুড়ে হামের বড় প্রাদুর্ভাবের মধ্যে তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—ভাইরাস কি বদলে গেছে? এত বছর ধরে ব্যবহৃত টিকা কি আর আগের মতো কাজ করছে না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাঠে নেমেছেন আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষকেরা। তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধান বলছে, আতঙ্কের সবচেয়ে বড় কারণ ভাইরাসের পরিবর্তন নয়। বরং সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে সেই শিশুরা, যারা এখনো টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি অথবা কোনো কারণে টিকার বাইরে রয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষাগারে ১৫ হাজার ২৭২ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে হামজনিত সন্দেহে ৭২১টি এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত ৯৫টি মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আইসিডিডিআর,বি ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা ৩৪১ জন শিশুর ওপর একটি অনুসন্ধান চালান। হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী এসব শিশুর মধ্যে ৩২৪ জনের হাম নিশ্চিত হয়। বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুদের চিত্র। এই বয়সী ১৪১ শিশুর মধ্যে ১৩৭ জনের শরীরে হাম ভাইরাস পাওয়া যায়।
গবেষকেরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে একটি স্বাভাবিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক বাস্তবতা। জন্মের সময় শিশু মায়ের কাছ থেকে কিছু অ্যান্টিবডি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেই সুরক্ষা দ্রুত কমে যায়। অন্যদিকে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী প্রথম হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয় নয় মাস বয়সে। ফলে তিন থেকে আট মাস বয়সের মধ্যে একটি সময় তৈরি হয়, যখন অনেক শিশুর শরীরে মায়ের দেওয়া সুরক্ষাও থাকে না, আবার নিজের টিকাজনিত সুরক্ষাও গড়ে ওঠেনি। জনস্বাস্থ্যবিদেরা এই সময়টিকে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
গবেষণার সংখ্যাগুলোও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। নয় মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের, অর্থাৎ ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে। টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের, অর্থাৎ ৯৭ শতাংশের হাম নিশ্চিত হয়েছে। এক ডোজ টিকা পাওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জন এবং দুই ডোজ পাওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
তবে এই পরিসংখ্যান নিয়ে ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ নেই বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। কারণ অনুসন্ধানটি করা হয়েছে কেবল হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সন্দেহভাজন রোগীদের মধ্যে। তাই দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের ৭৬ শতাংশের হাম শনাক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে টিকা অকার্যকর। বরং যাদের টিকার কোনো সুরক্ষা ছিল না, তাদের তুলনায় দুই ডোজ পাওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ কম পাওয়া গেছে, যা টিকার সুরক্ষামূলক ভূমিকার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
হামের ভাইরাস বদলেণ গেছে কি না এ জন্য ৫৫টি হাম ভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, সবগুলোই বি-৩ (B3) জিনোটাইপের, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বর্তমানে ছড়িয়ে রয়েছে। কয়েকটি মিউটেশন শনাক্ত হলেও সেগুলো নতুন নয় এবং অতীতেও বিভিন্ন দেশে পাওয়া গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব পরিবর্তনের কারণে টিকার সুরক্ষা নষ্ট হচ্ছে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আইসিডিডিআর,বি-এর সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, মানুষের উদ্বেগ স্বাভাবিক। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ভাইরাস টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই।
তাহলে এত বড় প্রাদুর্ভাব কেন? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি। গবেষকদের ধারণা, জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের হার ভালো হলেও দেশের সব এলাকায় একই চিত্র নেই। কোথাও কোথাও শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। আবার টিকার প্রথম ডোজ পাওয়ার আগের কয়েক মাস শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে।
আইসিডিডিআর,বি-এর জ্যেষ্ঠ পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। কিন্তু টিকাদানের হার সন্তোষজনক হওয়ার পরও কেন এত বড় প্রাদুর্ভাব হলো, সেটি খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।













