রূপগঞ্জের পল্লী বিদ্যুৎ অফিসগুলোতে এখন সেবার চেয়ে ‘সেলামি’র কদর বেশি
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ: সূর্য ডোবার আগেই অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে রূপগঞ্জ। দিন নেই, রাত নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে জনজীবন এখন বিপর্যস্ত। একদিকে শিল্পকারখানায় উৎপাদনের চাকা স্থবির হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগব্যাধি। বিশেষ করে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে উপজেলার কয়েক হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী।
রূপগঞ্জের বাতাস এখন কেবল গরম নয়, গুমোট হয়ে আছে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসে।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রূপগঞ্জ শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক মিলিয়ে মূলত ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর আওতায় পরিচালিত হয়। এ উপেজেলায় বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট (পিক আওয়ারে)। তবে বর্তমান সরবরাহ গড়ে ১৫০, ১৮০ মেগাওয়াট। ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বা তার সামান্য বেশি বিদ্যুৎ পাওয়ায় এলাকাভিত্তিক ২ ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাতের বেলা একটানা ৩-৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপগঞ্জ ও তার পার্শ্ববর্তী তারাব, ভুলতা, গোলাকান্দাইল, কাঞ্চন, কায়েতপাড়া এলাকায় প্রায় দেড় হাজার ছোট-বড় শিল্পকারখানা রয়েছে। টেক্সটাইল খাতে বিদ্যুতের সামান্য ফ্লাকচুয়েশনেও সূতা ও কাপড়ের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্প উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ প্রয়োজন হওয়ায় লোডশেডিংয়ে ফার্নেস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে জেনারেটর কেনার সামর্থ্য না থাকায় অনেক ছোট কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম।শিল্প মালিকদের মতে, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ৩০% থেকে ৪০% হ্রাস পেয়েছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহারে উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ।
কেন এত লোডশেডিং ?
অনুসন্ধানে রূপগঞ্জে লোডশেডিংয়ের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলার সংকটে গ্যাস ও কয়লা আমদানি ব্যাহত হওয়ায় চাহিদামত বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে রূপগঞ্জের অনেক এলাকায় ট্রান্সফরমার ও সাব-স্টেশনের ক্ষমতা চাহিদার তুলনায় কম। পুরাতন সঞ্চালন লাইনের কারণেও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে । অবৈধ সংযোগ ও সিস্টেম লসের কারণে কিছু অসাধু চক্রের যোগসাজশে বাণিজ্যিক এলাকায় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের ফলে সিস্টেমের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। গ্যাস সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হরিপুর ও সিদ্ধিরগঞ্জ কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় স্থানীয় গ্রিডে চাপ বেড়েছে । অবৈধ সংযোগের মচ্ছবের কারণে রূপগঞ্জের বাণিজ্যিক এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় কয়েক হাজার অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ চলছে, যা সিস্টেমের ওপর অতিরিক্ত লোড তৈরি করছে।
জরাজীর্ণ সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি থাকার কারণে ডেসকো ও পল্লী বিদ্যুতের অধিকাংশ ট্রান্সফরমার ও লাইন অতিরিক্ত লোড নেয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে, যা ঘন ঘন ট্রিপ করার অন্যতম কারণ। নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পাচ্ছি না । বরাদ্দ বাড়লে লোডশেডিং কমে আসবে। তবে জরাজীর্ণ লাইন সংস্কারের কাজ চলছে।”
অর্ধেক বিদ্যুৎ, দ্বিগুণ দুর্ভোগ।অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপগঞ্জ ও ভুলতা এলাকায় ডেসকো এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর দৈনিক সম্মিলিত পিক-আওয়ার চাহিদা প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ মিলছে মাত্র ১৪০ থেকে ১৬০ মেগাওয়াট। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে এলাকাভেদে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে। বিশেষ করে গভীর রাতে ৩-৪ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বড় কয়েকটি শিল্পকারখানা ও বেশ কিছু এলাকাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আবাসিক এলাকা ও ক্ষুদ্র কারখানাগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে রাখা হচ্ছে। এছাড়া জরাজীর্ণ ট্রান্সফরমার ও লাইনের কারণে সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে পুরো উপজেলা। কথা হয় নগরপাড়া এলাকার আনোয়ার মোল্লার সঙ্গে। তিনি বলেন, আর কইয়েন না ভাই। দিনো যেমন তেমন। রাইত অইলে কি যে যাওয়া যায় কারেন্ট ? বাইরে গিয়া বইয়া থাকন লাগে। আমাগো কায়েতপাড়া ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি কারেন্ট থাহে না।
রপ্তানি খাতে লাল বাতি ;অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপগঞ্জের তারাব, বরপা ও ভুলতা বেল্টে অবস্থিত টেক্সটাইল, ডাইং এবং স্পিনিং মিলগুলো বিদ্যুতের অভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।বিসিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির তথ্যমতে, লোডশেডিংয়ের কারণে মেশিনের সেন্সর নষ্ট হওয়া এবং হঠ্যাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় কাপড় ও সুতা নষ্ট হওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। অনেক কারখানা মালিক উচ্চমূল্যে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাচ্ছেন, যা উৎপাদন খরচকে আকাশচুম্বী করে দিচ্ছে। এতে বিশ্ববাজারে রপ্তানি প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সঠিক সময়ে উৎপাদন শেষ করতে না পারায় অনেক মালিককে ‘এয়ার শিপমেন্ট’ করতে হচ্ছে, যার খরচ সাধারণ শিপমেন্টের চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি। এতে অনেক ক্ষেত্রে লাভের বদলে মূলধন হারাতে হচ্ছে।
লোডশেডিংয়ের সময় শ্রমিকরা অলস বসে থাকলেও কারখানা মালিকদের হাজিরা ও বেতন পূর্ণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রচন্ড গরমে কারখানার ভেতরে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রমিকদের কর্মস্পৃহা ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে।
ইমেজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং কারখানার ম্যানেজার অলি উল্লাহ বলেন, আমাদের এখানে দিনে ১২ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে না। জেনারেটর চালিয়ে পোষাচ্ছে না। জেনারেটর ব্যবহারের তেল পাচ্ছি না। তেলের জন্য ইউএনও বরাবর আবেদন করছি। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা লাটে উঠবে।
ক্ষুদ্র শিল্পের ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ :অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপগঞ্জে ছোট-বড় প্রায় দেড় হাজার পাওয়ার লুম ইউনিট রয়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে গত ৩০ দিনে উৎপাদন বন্ধ ছিল গড়ে ১৬ ঘণ্টা। এতে কেবল সূতা ও কাপড় নষ্ট হয়ে লোকসান হয়েছে প্রায় ৯০ কোটি টাকা। বিদ্যুতের অভাবে কাজ না থাকায় ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ ভিত্তিতে প্রায় ২৫ হাজার দিনমজুর ও অস্থায়ী শ্রমিক গত ১৫ দিনে তাদের আয়ের ৪০ শতাংশ হারিয়েছেন। ভুলতা-গাউছিয়া এলাকার প্রায় ৪ হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী গরমে কাস্টমার না আসায় দিনে গড়ে ৪৫ হাজার টাকা করে বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা হারাচ্ছেন।
উপজেলার প্রায় ১১ জন ক্ষুদ্র কারখানার মালিকের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, বড় শিল্পগ্রুপগুলো জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন কিছুটা সচল রাখলেও বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার মালিকরা।তারাবো, রূপসী ও ভুলতা এলাকার ছোট ছোট পাওয়ার লুম, লেদ মেশিন এবং প্যাকেজিং কারখানাগুলোতে হাহাকার চলছে।পাওয়ারলুম কারখানার মালিক আক্কাস আলী বলেন, দিনে ১১-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালানো অসম্ভব। ডিজেলের দাম বাড়ায় খরচ পোষাতে পারছি না।শ্রমিকদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। এভাবে চললে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
” অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।ভুলতা ও গাউছিয়া মার্কেটের ক্ষুদ্র কাপড় ব্যবসায়ী রহিম মিয়া, ফজল মিয়া বলেন, বিদ্যুতের অভাবে কাস্টমার দোকানে বসতে পারে না। ফ্রিজের মালামাল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কাঁচাবাজার ও রেস্টুরেন্ট মালিকদের লোকসান এখন আকাশচুম্বী। গরমে আইসক্রিম বা কোমল পানীয়র ব্যবসা চাঙ্গা হওয়ার কথা থাকলেও বিদ্যুতের অভাবে তা থমকে গেছে।
জনস্বাস্থ্যর ‘হিট ম্যাপ’
রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ২ টি বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর গরমে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা ৩৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১০ দিনে ১১শ’ জন ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছেন বিভিন্ন হাসপাতালে।বিদ্যুৎ না থাকায় পাম্পের পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় মানুষ নোংরা পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তীব্র দাবদাহ আর লোডশেডিংয়ের মরণকামড়ে রূপগঞ্জের ঘরে ঘরে রোগব্যাধি হানা দিয়েছে।বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি। দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎহীন ঘরে ঘামাচি, চর্মরোগ ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে।গরমে পানি ও খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহে আউটডোরে আসা রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যাদের অধিকাংশই জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। কথা হয় নগরপাড়া এলাকার গৃহবধূ মরিয়র আহম্মেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, গরম আর লোডশেডিংয়ের কারণে ছোট ছেলে আজ কয়েকদিন ধরে জ্বরে ভুগছে। রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিব জুবায়ের নাদিম বলেন, গরমের কারণে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। এসময় হিটস্ট্রোক বেড়ে যায়। সবার পানি ও তরল জাতীয় খাবার বেশি খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
কোথায় যাচ্ছে রূপগঞ্জের বিদ্যুৎ ?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরাদ্দ কম থাকার পাশাপাশি রূপগঞ্জের ভেতরের ‘সিস্টেম লস’ ও ‘পাওয়ার ডাইভারশন’ এই সংকটকে চরম সীমায় নিয়ে গেছে। অবৈধ কমার্শিয়াল লাইনের কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৬ হাজার অবৈধ বাণিজ্যিক সংযোগ রয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও বিদ্যুৎ বিভাগের অসাধু চক্রের যোগসাজশে এই লাইনগুলো চলে, যা বৈধ গ্রাহকদের লোড কেড়ে নিচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু বিশেষ শিল্প মালিকের কারখানায় ‘ডেডিকেটেড লাইন’ সচল রাখতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ফিডারগুলো টানা ৪-৫ ঘণ্টা বন্ধ রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ গরিবের অন্ধকার দিয়ে ধনীর চাকা সচল রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আলোর ফেরিওয়ালার ‘অন্ধকার’ কারবার
সরকারি কাগজে-কলমে ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ হলেও রূপগঞ্জের সাধারণ গ্রাহকদের কাছে পল্লী বিদ্যুৎ এখন এক মূর্তমান আতঙ্কের নাম। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিল্পাঞ্চলখ্যাত রূপগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসগুলোর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। নতুন সংযোগ প্রদান, মিটার পরিবর্তন থেকে শুরু করে লোডশেডিংয়ের নামে বৈষম্য সবখানেই এখন দালালের দৌরাত্ম্য ও অসাধু কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট। সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, টাকা ছাড়া এখানে কোনো সেবা মেলে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপগঞ্জ জোনাল অফিসের অধীনে নতুন আবাসিক বা বাণিজ্যিক সংযোগ নিতে সরকারি ফি’র চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে গ্রাহকদের অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের সাথে অফিসের কিছু অসাধু লাইনম্যান ও টেকনিশিয়ান সরাসরি জড়িত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তারাব পৌরসভার বরাব এলাকার বাসিন্দা মোহন মিয়া বলেন, মিটার সংযোগের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি জমা দিলেও মাসের পর মাস ঘুরতে হয়েছে। পরে দালালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অংকের টাকা দেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে মিটার চলে এসেছে। বিদ্যুৎ অফিসের ইট-বালুও টাকা খায়। মিটার রিডারদের বিরুদ্ধে বাড়িতে না গিয়েই মনগড়া রিডিং বসানোর অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যবহৃত ইউনিটের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বিল পাঠানো হচ্ছে। এই ‘ভুতুড়ে বিল’ সংশোধনের জন্য অফিসে গেলে গ্রাহকদের পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। দিনের পর দিন ঘুরেও সমাধান না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় রূপগঞ্জে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক। অভিযোগ রয়েছে,
বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার বিনিময়ে সাধারণ গ্রাহকদের এলাকায় অঘোষিত ও দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলা আবাসিক এলাকায় যখন মানুষ বিশ্রামে থাকে, তখন শিল্প কারখানায় লোড ঠিক রাখতে সাধারণের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার নজির মিলছে প্রতিনিয়ত। অভিযোগ জানাতে কল সেন্টারে ফোন করলে সাড়া না পাওয়া বা দায়িত্বরতদের দুর্ব্যবহার এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়।অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিনে তদন্ত বা প্রতিকার পাওয়ার হার খুবই নগণ্য এসব বিষয়ে পূর্বাচল জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মুহাম্মদ মনির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “আমরা সরকারি বিধি মোতাবেক গ্রাহক সেবা দিচ্ছি। যদি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, বিদ্যুতের খুঁটি আছে, তার আছে, এমনকি মাসিক বিলের কাগজও সময়মতো পৌঁছায়; শুধু পৌঁছায় না কাঙ্খিত সেবা। রূপগঞ্জের পল্লী বিদ্যুৎ অফিসগুলোতে এখন সেবার চেয়ে ‘সেলামি’র কদর বেশি। নতুন সংযোগ মানেই দালালের দুয়ারে ধরনা, আর অভিযোগ জানানো মানেই কালক্ষেপণের চক্র।
রূপগঞ্জের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য অভিযোগের সূত্র ধরে কালের কণ্ঠ খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছে এই অনিয়মের আসল উৎস।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটি আবাসিক মিটারের জন্য সরকারি ফি ও জামানত বাবদ ৮শ’ টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়।কিন্তু রূপগঞ্জের তারাব, গোলাকান্দাইল ও কায়েতপাড়া এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দালালের মাধ্যম ছাড়া আবেদন করলে ফাইল মাসের পর মাস পড়ে থাকে ‘টেকনিক্যাল ত্রুটি’র অজুহাতে। অথচ স্থানীয় দালাল বা অফিসের লাইনম্যানদের হাতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা তুলে দিলে মাত্র এক সপ্তাহেই বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছে মিটার। ভুক্তভোগী এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চার মাস ঘুরেও মিটার পাইনি। পরে অফিসের পাশের এক ‘বড় ভাই’কে ১৬ হাজার টাকা দেওয়ার পর তিন দিনেই সংযোগ দিয়ে গেছে।
কর্তৃপক্ষের সাফাই:
তারাব জোনাল অফিসের ডেপুটি ম্যানেজার আশরাফুল আলম খান বলেন, আমাদের ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকে প্রতিদিন। এটা শিল্প এরিয়া। এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (কারিগরি) প্রকৌশলী আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, “আমাদের লোকবল কম, তাই কিছু সমস্যা হতে পারে। তবে কেউ টাকা চাইলে আমাদের সরাসরি জানানো উচিত।আমরা অনিয়ম বরদাশত করি না”। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে জ্বালানি সংকটের কারণে। যদিও ভুক্তভোগীদের দাবি, সরাসরি অভিযোগ দিলে হিতে বিপরীত হয় এবং হয়রানি আরও বাড়ে। উত্তরণের পথ শিল্প অগ্রাধিকার জোন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে রূপগঞ্জের শিল্প এলাকাগুলোতে বিশেষ ফিডারের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা।
সৌর শক্তির প্রসার করে বড় বড় কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনে সরকারি ভর্তুকি ও উৎসাহিত করা। সঞ্চালন লাইনের সংস্কার করে দ্রুততম সময়ে জরাজীর্ণ সঞ্চালন লাইন ও ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপন। অপচয় রোধ করে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নে নিয়মিত অভিযান ও স্মার্ট প্রিপেইড মিটার দ্রুত বাস্তবায়ন করা। রূপগঞ্জ কেবল একটি উপজেলা নয়, এটি দেশের অর্থনীতির হৃৎপিন্ড। এই হৃৎপিন্ডে বিদ্যুতের রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক না হলে অচিরেই জাতীয় অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীমহল।












