ইসলাম বা হিন্দু নয়, বাঙালির আসল ধর্ম ভুগিচুগি-মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
দৈনিকআগমনী: “ইসলাম বা হিন্দু নয়, বাঙালির আসল ধর্ম ভুগিচুগি। এবং জাতিটির, প্রধান খাদ্যও ভুগিচুগি। বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, শিল্পকলা— এগুলো ততক্ষণ দুর্বোধ্য, নীরস, বাঙালির নিকট, যতোক্ষণ না সেগুলোতে পর্যাপ্ত ভুগিচুগি মেশানো হয়। ভুগিচুগি মেশালেই কেবল সে আগ্রহী হয়। যেকোনো বাঙালির কাছে সলিড সৎ ইকোনোমিক মডেল নিয়ে যান, আপনাকে ধান্ধাবাজ বলবে। কিন্তু ডেসটিনি’র ভুগিচুগি বোঝান— টাকা দিয়ে দেবে।
আমার সাথে একবার হুমায়ূন আহমেদের দেখা হয়েছিলো। জিগ্যেস করেছিলাম— মিসির আলী, হিমু, দেবী, ম্যাজিক মুনসী, এই ভুগিচুগিগুলো কেন লেখেন? বলেছিলেন— এগুলো যে ভুগিচুগি তা নিজেও বুঝি, কিন্তু যে-এলাকায় নজরুলের লেখা চুরি করে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পায়, সে-এলাকায় ভুগিচুগি না লিখে উপায় কী?
হুমায়ুন আজাদের কবরে একটি জাম্বুরা গাছ ছিলো। তার নিজ বাড়ির উঠানে। ভয়ে সেই জাম্বুরা কেউ খায় না। একদিন আড়িয়াল বিল থেকে ফেরার পথে আমি ওই জাম্বুরা খেয়ে ফেললাম। লোকজন বললো, সর্বনাশ, করলেন কী, কবরের উপরের জাম্বুরা খেয়ে ফেললেন? বললাম, পৃথিবীর সব গাছই কবরের উপর দাঁড়ানো। শুধু মানুষের কবরই কবর না। শিশুরা সায় জানালো। জাম্বুরা পাড়তে পাড়তে বললো, পোকামাকড়ের কবরও কবর। আঙ্কেল ঠিক বলেছেন।
প্রতিটি বাঙালি তার সন্তানকে ভুগিচুগির ভেতর বড় করে। শেখানো হয়— আল্লাহ বিশ্বাস করলে জ্বিন ভূতও বিশ্বাস করতে হবে। জ্বিন বিশ্বাস না করলে ঈমান থাকবে না। পৃথিবীর আর কোনো মুসলমান দেশে এমন কথা শুনি নি। যে-জাতি জ্বিনবিশ্বাসকে আল্লাহবিশ্বাসের শর্ত ভাবে, সে-জাতিকে ভুগিচুগি ছাড়া খাওয়াবেন কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শমসের আলী নামে এক অধ্যাপক ছিলো। পিএইচডিওয়ালা। লোকটি জ্বিন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব করেছিলো! কেন একজন লোক পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করেও ভুগিচুগি বিশ্বাস করে? কারণ তার উইজডম ফ্রাজাইল। শৈশব ও যৌবন দুটোই কাটিয়েছে ভুগিচুগিবাজ সমাজে।
যারা মিস্টিক বা সুফি লিটারেচারের সাথে পরিচিত, তারা জানবেন— এগুলোর বড় উপাদান ভুগিচুগি। আমি হার্শ ম্যাটেরিয়ালিস্ট নই। ডিসক্লোজার সাপেক্ষে চটুসাহিত্যে ভুগিচুগি অনুমোদন করি। বিনোদনের স্বার্থে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের মতো ডিসক্লোজার ছাড়া ম্যাজিক মুন্সী লিখে ভুগিচুগি ছড়ালে তাকে দড়ি দিয়ে বাঁধতে হবে। এ জন্য বিজ্ঞানের লোক হওয়ার দরকার নেই। সৎ চিন্তার সাধারণ পাঠকেরও দায় আছে, সত্যের মুখোশে ভুগিচুগির প্রচার ঠেকানোর।
বাঙালি মুসলমান নিজ ধর্মের রি-ইনফোর্সমেন্ট এতো বেশি খুঁজে যে, যেকোনো ফালতু কথাকে মিস্টিসিজম ও রহস্য মিশিয়ে পরিবেশন করলে আল্লাহ আল্লাহ শুরু করে। গীতা বা ত্রিপিটক তেলাওয়াতে সে সঙ্গীত খুঁজবে না, কিন্তু কোরান তেলাওয়াতে একশো নব্বই প্রকার সঙ্গীত খুঁজে বেড়াবে। ইহুদীদের আজানে রহস্য খুঁজবে না, কিন্তু মুসলমানের আজানে দুই কোটি রহস্য ও চার কোটি গভীর বাণী আবিষ্কার করবে।
এবং সে রহস্য জিনিসটাও বোঝে না। অতি মামুলি বিষয়ও বাঙালির নিকট গভীর রহস্যময়! যে-লোক পাটিগণিত ছাড়া আর কোনো গণিত জানে না, তার কাছে সমাকলন ব্যবকলন বা রিম্যানিয়ান জ্যামিতি গভীর রহস্যময় ঠেকবে, এই স্বাভাবিক।
এটা দোষের নয়। দোষের হলো, কম বুঝকে বেশি বুঝ ধরে নিয়ে সত্যিকারের বেশি বুঝকে সন্দেহ করা। নিউটনের মহাকর্ষে আকর্ষণ বল আছে, কিন্তু আইনস্টাইনের মহাকর্ষে কোনো আকর্ষণ বল নেই। পৃথিবী বা সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরা, এসবও নেই। আছে স্পেসটাইম কার্ভেচার ও জিওডেসিক। জিওডেসিক না বোঝা লোক যখন ‘আলো বাঁকা পথে যায়’ শুনবে, বা পড়বে টাইম ডাইলেশনের কথা, তখন খুব রহস্য ও গায়েবী কুদরত অনুভব করবে। এবং ভুগিচুগি মিশিয়ে ‘নবী চোখের পলকে মেরাজে গিয়েছেন’, এই জিনিস ব্যাখ্যা করবে। পুরো ফেসবুক ভরে আছে এই ধরণের আত্মবিশ্বাসী ব/ল*দে।”













