রাশিয়া বিশ্বকাপের ব্যর্থ তারকারা

বিশ্বকাপ হলো তারকাদের নিজেদের প্রমাণ করার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম। এখানে ভালো করে নিজের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল করার তথা ইতিহাসে নিজের নাম লিপিবদ্ধ করার সুবর্ণ সুযোগ। কেউ সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেকে উপরে তোলেন, আবার কেউবা প্রত্যাশামতো না খেলতে পেরে অবস্থান হারিয়ে ফেলেন।

দাভিদ দে গিয়া
অনেকের চোখেই তিনি বিশ্বের সেরা গোলরক্ষক। তবে এটা সত্যি যে, বিশ্বকাপের আগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের স্প্যানিশ গোলরক্ষকে অনায়াসে বিশ্বসেরা হিসেবেই ভাবা হতো। কিন্তু তার মতো বিশ্বসেরা গোলরক্ষকের গ্লাভসজোড়াও রাশিয়ায় বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে।

দে গিয়া সাধারণত গোলবারের মতো সামনে দৃঢ় অবস্থান আর দারুণ শারীরিক দক্ষতার জন্য বিখ্যাত। তার ক্যারিয়ারে এমন অনেক মুহূর্ত আছে যেখানে বহু নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ফ্রি কিক আটকাতে ব্যর্থ হওয়া বেশ দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে। সেই ম্যাচে রোনালদো একাই হ্যাটট্রিক করে বসেন, যা গোলরক্ষক দে গিয়ার সামর্থ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে।

এটা সত্য, অনেক ভাল খেলোয়াড়েরও ভুল হয়, কিন্তু যখন সেটা কোন গোলরক্ষক করেন, তা দলের জন্য বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই ম্যাচে দে গিয়াকে বারবারই পরাস্ত হতে দেখা গেছে। রাশিয়ার কাছে হেরে শেষ ষোল থেকেই বিদায় নিয়েছে স্পেন এবং ওই ম্যাচের দলে না রাখার দাবি

সত্ত্বেও একাদশে তাকে রাখায় অনেকে সমালোচনা করেন। সে করতে চাইবেন। তবে এই তালিকায় আমরা শুধু ম্যানচেস্টার সিটির আর্জেন্টাইন সেন্টার-ব্যাক নিকোলাস ওতামেন্দিকে নিয়ে কথা বলছি।

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়ন সিটিজেনদের শিরোপা জয়ে বড় ভূমিকা রাখায় তার কাছে প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে অরক্ষিত করে রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়টা তার ঘাড়েই চাপবে। তার বেশকিছু ভুলের মাশুল গুনতে হয়েছে সাম্পাওলির দলের।

এমনিতেই আর্জেন্টাইন রক্ষণ আন্তর্জাতিক ফুটবলে অনভিজ্ঞ। লেফট-ব্যাকে অনভিজ্ঞ নিকোলাস তাগলিয়াফিকো,  রাইট-ব্যাকে আদতে রাইট-উইঙ্গার এদুয়ার্দো সালভিও এবং দুর্বল গোলরক্ষণ মিলিয়ে দলটির রক্ষণ একেবারেই আনাড়ি হিসেবেই বিশাল ভার বহন করেছে। মূল গোলরক্ষক রোমেরোর অনুপস্থিতিতে রক্ষণ সামলানোর ভার ছিল মূলত ওতামেন্দি ও মার্কোস রোহোর কাঁধে।

কিন্তু বিশ্বকাপে বিশেষ করে ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে তার রক্ষণ সামলানোর ব্যর্থতা দলকে ডুবিয়েছে। তার পা থেকে বল কেঁড়ে নিতে খুব বেশি অসুবিধায় পড়তে হয়নি প্রতিপক্ষের ফুটবলারদের। সব দায় নিশ্চয়ই ওতামেন্দির একার নয়, কিন্তু বড় দায়টা যে তারই তা অস্বীকার উপায় নেই বললেই চলে।

টমাস মুলার
বিশ্বকাপে যার নামের পাশে ১০ গোল, তার কাছে দলের চাহিদা থাকবে সবচেয়ে বেশি তা নিশ্চয়ই বলে বুঝাতে হবে না। তার সুযোগ ছিল জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬টি বিশ্বকাপ গোলের বিশ্বরেকর্ডে ভাগ বসানোর। কিন্তু মুলার এবং জার্মানির জন্য সবই বিপরীত ঘটলো। সমস্যা এমনই দাঁড়ালো যে, দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দলের সেরা স্ট্রাইকারকে বসিয়ে রাখতে হলো কোচ জোয়াকিম লো’কে।

রাশিয়া বিশ্বকাপ অনেক চমক উপহার দিয়েছে। তবে এই চমকের ভিড়ে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানির গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়টা সবচেয়ে বড় চমক হয়ে এসেছে। একমাত্র টনি ক্রুস ছাড়া জার্মানির কোন খেলোয়াড়কেই বিশ্বমানের মনে হয়নি এই আসরে।

অথচ বিশ্বকাপের শুরুতে এই জার্মান দলটিকেই ফেবারিট হিসেবে ভাবা হচ্ছিল। দলে বায়ার্ন মিউনিখের ফরোয়ার্ড টমাস মুলারের মতো সেরা স্ট্রাইকার ছিলেন। এর আগের দুই বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ২০১৪ সালে শিরোপার স্বাদ নিয়েছিলেন তিনি। এখন অনেকেই মনে করছেন এই ‘বুড়ো’ তারকাকে দেশে রেখে আসলেই ভাল করতো জার্মানি।

রবার্ত লেভানডভস্কি
এবার তার চেয়ে বেশি হতাশাজনক বিশ্বকাপ মনে হয়না আর কারও কেটেছে। বায়ার্ন মিউনিখের স্ট্রাইকার লেভানডভস্কিকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে উদিয়মান তারকা ভাবা হচ্ছিলো, কিন্তু তিনি প্রত্যাশার ছিটেফোঁটাও দেখাতে পারেন নি।

অথচ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ১০ ম্যাচে ১৬ গোল করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন পোল্যান্ডের সেরা তারকা লেভানডভস্কি। বাছাইপর্বে তার সমান গোলের দেখা পাননি মেসি, রোনালদো, কাভানি, জেসুস, সানচেজ কিংবা লুকাকুর মতো তারকারাও।

বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে তার নামের পাশে দু’টি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ২ গোলের রেকর্ড ছিল, বিশ্বকাপ শেষেও তার নামের পাশে ওই ২ গোলই রয়ে গেছে। সেনেগাল, কলম্বিয়া ও জাপানের বিপক্ষে কোন গোলের দেখা তো পাননি তিনি।

সবচেয়ে চিন্তার বিষয়, তাকে তার স্বাভাবিক খেলার ধারে কাছেও দেখা যায়নি। তিন ম্যাচে দলের জন্য গোলের তেমন কোন সুযোগও তৈরি করতে দেখা যায়নি তাকে। বিশ্বকাপের আগে তাকে দলে নিতে চেলসি ও রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবের আগ্রহ ছিল দেখার মতো। কিন্তু বিশ্বকাপের ব্যর্থতা তার সেই সম্ভাবনা শেষ করে দিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

নেইমার
এই তালিকায় নেইমারের নাম অনেকেই ভাল চোখে দেখবেন না। কারণ, বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলের অন্যতম সেরা পারফর্মার হিসেবেই দেখা হবে তাকে। কয়েকটি ম্যাচে তাকে বেশ ভাল খেলতে দেখা গেছে। কিন্তু রাশিয়া বিশ্বকাপে তার কাণ্ডকীর্তি তার ইমেজ, বিশ্বস্ততা এতটাই নেমে গেছে যে তার অনেক পাড় ভক্তও তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

সাবেক বার্সা তারকা তার দলকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত উঠতে বড় ভূমিকাই রেখেছেন। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তার ‘ডাইভিং’, সত্যি বলতে অভিনয়ের কারণে তাকে নিয়ে বহু ভক্ত হতাশ। সারা বিশ্বেই তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে শুধু এই কারণে।

দুঃখের বিষয়, এই ডাইভিং এখন আধুনিক ফুটবলে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় নেইমার একে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন। ইনজুরির ভান করা, গায়ে ছোঁয়া না লাগলেও চিৎকার দিয়ে কেঁদে ফেলা, সামান্য ধাক্কায় গড়াগড়ি খাওয়া মিলিয়ে তার মতো একজন সেরা তারকার কাছে ভক্তদের প্রত্যাশা এমন কিছুই ছিল না, যা তিনি করেছেন।

বিশ্বকাপের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমী মানুষ ব্রাজিলের ফুটবল সৌন্দর্য দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। খেলার ফলাফলের চেয়েও ব্রাজিলের খেলার ছন্দ উপভোগ করতেই মাঠে কিংবা টেলিভিশনে চোখ রাখেন এমন ফুটবলভক্ত অগণিত।

এমনকি ব্রাজিলকে যারা অপছন্দ করে তারাও এই সৌন্দর্যকে অবহেলা করতে পারেনা। সারা বিশ্বই ব্রাজিলকে দেরিতে বিদায় নিয়ে দেখতে চায়। কিন্তু এবার ‘নেইমার’ সব পাল্টে দিলেন। পাড় ব্রাজিলভক্তও নেইমারের কাণ্ডে চরম বিরক্ত। অথচ ব্রাজিলের হয়ে সবচেয়ে বড় ব্যর্থ নাম হলো গ্যাব্রিয়েল জেসুস। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে নামটা নেইমারেরই।







সম্পাদক ও প্রকাশকঃ জামাল হোসেন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মোঃ মোনাজ্জেল হোসেন খান
নির্বাহী সম্পাদক : নাঈম ইসলাম
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৭কে,মেহেরবা প্লাজা ৩৩ তোপাখানা রোড,ঢাকা
ফোনঃ 01947171171
মেইলঃdailyagomoni2018@gmail.com
প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।